মিডওয়াইফ কে বা কারা, জানেন কি?লেখক : রেজওয়ানা- রংপুর, বাংলাদেশ।

আসসালামু-আলাইকুম। আজ আমি আমার এই পোস্টটির মাধ্যমে মিডওয়াইফ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা উপস্থাপন করতে চলেছি। আসা করি আপনাদের অনেক ভালো লাগবে এবং মিডওয়াইফ সম্পর্কে জানতে পারবেন। তাই দেরি না করে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।

Content:

১। মিডওয়াইফ কে বা কারা?

২। বাংলাদেশে মিডওয়াইফদের ইতিহাস ও          অগ্রগতি।

৩। মিডওয়াইফদের কাজ কি? কী ধরনের          সেবা মিডওয়াইফ প্রদান করে থাকে।

৪। দক্ষ মিডওয়াইফ দিলে নেতৃত্ব, সফল হবে        নিরাপদ মাতৃত্ব

৫। আমি গর্বিত, আমি মিডওয়াইফ।

৬। উপসংহার।

১। মিডওয়াইফ কে বা কারা?

 

মিডওয়াইফ একজন নারী। যিনি মিডওয়াইফারি শিক্ষা প্রোগ্রামের মাধ্যমে মিডওয়াইফারি কোর্স সম্পন্ন করেন, পরবর্তীকালে সরকার কর্তৃক রেজিস্ট্রার / লাইসেন্স প্রাপ্ত হন এবং মিডওয়াইফারিকে নিজ পেশা(Profession ) হিসাবে গ্রহণ করেন। একজন মিডওয়াইফের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তীকালীন সার্বিক সেবা সুনিশ্চিত করা। এবং সুস্থ শিশু জন্মদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা।

২। বাংলাদেশে মিডওয়াইফদের ইতিহাস ও অগ্রগতি।

বাংলাদেশে মিডওয়াইফদের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। মাত্র কয়েক বছর পূর্বেই এই ধারণাটির সুচনা হয় বাংলাদেশে।

 

বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল এর এক তথ্য মতে জানা যায়, জাতিসংঘের অনুষ্ঠিত ৬৫তম সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডওয়াইফ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেন এবং দেশের মিডওয়াইফারি সেবা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তার দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির আলোকে ২০১০ সাল থেকে সারা দেশের গর্ভবতী মা ও নবজাতকের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৪২১ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও এক হাজার ৩১২ টি ইউনিয়ন সাব সেন্টারে তিন হাজার মিডওয়াইফারি পদ সৃষ্টি করা হয়। এবং ৩৪২ টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও ২৯ ইউনিয়ন সাব সেন্টারে ১১৪৯জন রেজিস্ট্রার প্রাপ্ত /লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ নিয়োগ প্রদান করা হয়।

 

মিডওয়াইফারি শিক্ষা অগ্রগতির লক্ষ্যে  সরকার ২০১৩ সাল থেকে দেশের প্রথম ২০ টি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫২৫ আসনে তিন বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্স চালু করে।বর্তমানে সেখানে সরকারি ৪১টি নার্সিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০৫০টি আসন বর্ধিত করা হয়েছে। তথ্যমতে বতর্মানে সারাদেশে ৪৪০০ জন রেজিস্ট্রার/লাইসেন্স প্রাপ্ত মিডওয়াইফ রয়েছে।

সেই সঙ্গে মিডওয়াইফদের শিক্ষা ও সেবা মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গুলো হচ্ছে :

– প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একই কারিকুলামে একই পাঠদানের     ব্যবস্থা।

– একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন।

-উচ্চতর ডিগ্রির জন্য বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওাইফারি কাউন্সিলের উদ্যোগে বিএসসি ইন মিডওয়াইফারি কারিকুলাম অনুমোদন।যা চলতি বছর থেকে কার্যক্রম সুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে এমএসসি ইন মিডওয়াইফারি কারিকুলাম প্রণয়ন কাজ অব্যাহত রয়েছে।

দক্ষ শিক্ষক তৈরিতেও দেয়া হয়েছে বিশেষ জোর। যার ফলশ্রুতিতে এরই মধ্যে সুইডেন ডার্লানা ইউনিভার্সিটি /বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১২০ জন শিক্ষক মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।বর্তমানে আরো অনেকেই অধ্যয়নরত রয়েছেন।

৩। মিডওয়াইফদের প্রধান কাজ কি? কী ধরনের সেবা মিডওয়াইফরা প্রদান করে থাকে?

মিডওয়াইফদের কাজের কথা বর্ণনা করতে গেলে আমি এটাই বলবো যে, মিডওয়াইফদের প্রধান কাজ হচ্ছে গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুর সুস্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করা।সরকার মিডওয়াইফদের প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি বিশেষ  লক্ষ্য নিয়ে,অর্থাৎ দেশের মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা। আর এরই ধারাবাহিকতায় মিডওয়াইফরা যে সমস্ত সেবা প্রদান করে থাকে তার মধ্যে অন্যতম:-

– গর্ভধারণ পূর্ববর্তী সেবা(Pre-conceptional care) মা       গর্ভধারণে কতটা সক্ষম ও জটিলতা মুক্ত কিনা তা           যাচাইকরণ। এবং নিরাপদ গর্ভধারণ  নিশ্চিত করণ।
– গর্ভকালীন সেবা(Antenatal care) বা গর্ভকালীন             ভিজিট নিশ্চিত করার মাধ্যমে মা এবং গর্ভের বাচ্চার       সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করণ। এবং যেকোনো জটিলতা              মোকাবেলা স্বরুপ পরামর্শ প্রদান এবং ডাক্তারের নিকট প্রেরণ।
– প্রসবকালীন সেবা নিশ্চিত করা এবং নরমাল                  ডেলিভারির জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে            প্রসবকালীন যেকোনো  ঝুঁকি কমিয়ে আনা।
-প্রসব পরবর্তী ৬ সপ্তাহ পযর্ন্ত মা ও শিশুর সাস্থ্য সম্পর্কে সেবা ও পরামর্শ প্রদান। শিশুর মাতৃদুগ্ধ পান/ব্রেস্টফিডিং(Breastfeeding) সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান।এবং মাকে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি  (personal hygiene ) সম্পর্কে সচেতন করা।
– নবজাতকের যত্ন, নবজাতকের বিপদ চিহ্নি সম্পর্কে   অবগত করা।

৪। দক্ষ মিডওয়াইফ দিলে নেতৃত্ব,সফল হবে নিরাপদ মাতৃত্ব।

 নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই সারা বিশ্বে মিডওয়াইফের সুচনা হয়। বাংলাদেশও এই লক্ষ্যের বাহিরে নয়।তাইতো সরকারের মিডওয়াইফ তৈরিতে নানান পদক্ষেপ গ্রহণ। কারণ মিডওয়াইফ শুধু মিডওয়াইফ হলে চলবে না তাকে হয়ে উঠতে হবে একজন দক্ষ মিডওয়াইফ। কারণ একজন দক্ষ মিডওয়াইফ জানেন কখন কোন পদক্ষেপ  মা ও শিশুর জন্য সর্বাত্মক গ্রহণযোগ্য।  গর্ভধারণ থেকে বাচ্চা প্রসব পর্যন্ত পুরো সময়টাই মায়ের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় একজন মিডওয়াইফ। এক্ষেত্রে দক্ষ মিডওয়াইফের কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ মিডওয়াইফ তার অর্জনকৃত জ্ঞান, কাজের দক্ষতা, উপস্থিত চিন্তাচেতনা ও পরিস্থিতি অনুসারে সিধান্ত গ্রহণের  মাধ্যমে  মায়ের যেকোনো জটিলতা মোকাবেলা করার ক্ষমতা রাখে।যা মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য বয়ে আনে এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যত সুগম করে। এক্ষেত্রে মিডওয়াইফকে যতটা না হতে হবে দক্ষ ঠিক ততটাই রোগীর প্রতি হবে সহমর্মী এবং বন্ধুসুলভ।

৫। আমি গর্বিত, আমি  মিডওয়াইফ

মিডওয়াইফ সেতো একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন সময়ের প্রতিটি মূহুর্তে পাশে থাকা পরম সঙ্গী।মিডওয়াইফের বন্ধুসুলভ প্রকাশ গর্ভবতী মাকে এনে দেয় পরম প্রশান্তি।
একজন মিডওয়াইফ হিসাবে আমি গর্ববোধ করি। আমি গর্বিত কারণ আমি  একজন মিডওয়াইফ। মিডওয়াইফের মতো এমন একটি মহৎ পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারা আসলেই ভাগ্যের বিষয়। আর এই গর্ববোধ থেকেই আমাকে আমার কাজের প্রতি থাকতে হবে সদা বিচক্ষণশীল। আমি আসা রাখি আমি আমার গর্ববোধকে আজীবন ধরে রাখতে পারবো আমার সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। আমি আমার এই চেতনা থেকে বলতে চাই:
আমি গর্বিত, আমি মিডওয়াইফ;
    আমার পেশা আমার গর্ব।
 আমার অর্জিত সবটুকু দক্ষতা দিয়ে,
প্রসূতি মাগো তোমার সেবা করবো।
ভেবো মোরে তোমার সুখ দুঃখের সাথী
 তোমার সুস্থতা,সেতো আমার প্রশান্তি।

৬। উপসংহার

মিডওয়াইফারি সেবা বতর্মান সময়ে বহুল আলোচনার বিষয়। দেশের মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে বর্তমানে মিডওয়াইফদের কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল এর বহুমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়নে মিডওয়াইফারি স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে নতুন দিগন্ত। হয়তো এখনো জনসাধারণের কাছে মিডওয়াইফের ধারণা সুস্পষ্ট নয়। তবে আসা করি খুব শিগ্রই মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফ জনপ্রিয়তা লাভ করবে।
সর্বপরি আপনাদের সকলকেই আন্তরিক ধন্যবাদ।এত ধৈর্য্য সহকারে পুরো আর্টিক্যাল পরার জন্য। যতি কোনো ভুলত্রুটি থাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আল্লাহ আপনাদের সকলকেই সুস্থতা দান করুন। সকলকেই জানাই আল্লাহ-হাফেজ। আসসালামু-আলাইকুম।
লেখক : রেজওয়ানা।
রংপুর, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.