নার্সিং এ ছেলেদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে

মহামারি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরুষরা নারীদের চেয়ে বেশি সময় দিয়ে কাজ করতে পারেন। নারীরা রান্নাঘর, সন্তান, সংসার সামলানোর ঝামেলা ও শারীরিক সক্ষমতার দরুণ পুরুষের সমান সময় দিয়ে কাজ করতে পারে না।

শুরুটা করতে চাই একটি সুখবর দিয়ে। নার্সিংয়ে বিশ্বের সব দেশে নারী-পুরুষ সকলের সমান অংশগ্রহণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। যেখানে নার্সিং পেশায় আগ্রহী করতে রাখা হয়েছে নানা চমকপ্রদ সুযোগ-সুবিধাও। চলতি বছরকে নার্স ও মিডওয়াইফ বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। এটিকে কেন্দ্র করে এ বছরের মধ্যে নার্সিং পেশায় পুরুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

আমেরিকা এ বছরের মধ্যে নার্সিং পেশায় পুরুষদের অংশগ্রহণ ২০ শতাংশ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এটি সত্যি যে,নার্সিং শিক্ষার গোড়াপত্তন হয় নারী পেশা হিসেবে। তাই কোন দেশেই পুরুষরা তেমন আগ্রহী হননি এ পেশায় কাজ করতে।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (নার্সিংয়ের জনক) তিনিও বিশ্বাস করতেন নার্সিংটা মেয়েদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য, অর্থাৎ নার্স বললে মেয়েদের অবয়ব বা কোমলপ্রাণ এটি বোঝায়। তাই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটা নারীদের জন্য শুরু করেছিলেন। যুগ যুগ ধরে এ পেশায় পুরুষদের ক্যারিয়ার গঠন বা সংযুক্ত হওয়ার বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

১৯০১ সালে প্রথম নার্সিং কাউন্সিল আইন নিউজিল্যান্ডে হয়। Nosocomial শব্দটি ল্যাটিন শব্দ nosocomi যার অর্থ পুরুষ পরিচর্যাকারী। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষদের এ পেশায় আগমন মহামারিকে কেন্দ্র করে। প্লেগ রোগের বিস্তারের সময় ইউরোপে প্রথম পুরুষেরা প্রাথমিক সেবা দানকারী হিসেবে যোগদান করেন। তৃতীয় শতাব্দীতে প্যারাবোলানীর পুরুষেরা একটি হাসপাতাল তৈরি করেছিলেন, এতে নার্সিং সেবা প্রদান করতেন।

চৌদ্দশ’ শতাব্দীতে এলেকজিয়ান নার্সরা সেন্ট গডস ব্রাদার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন রোমে। যেখানে পৃথিবীর প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ক্রিস ক্যালভিন প্রথম পুরুষ নার্সের দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে নার্সিং পেশায় পুরুষেদের আর্বিভাব। পুরুষরা ধীরে ধীরে নিজকে নিয়োজিত করে।

তবে এখনও অবধি অনেক দেশে নার্সিং পেশার পুরুষদের শতকরা হারে অনেক কম। চায়নায় মাত্র ১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সৌদি আরবে ৩২ শতাংশ। আর বাংলাদেশে এ হার ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ২০১৯ সালের মার্চে Gender equity in health workforce এই শিরোনামে বিশ্বের ১০৪টি দেশে সমাজ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর একটি জরিপ চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ নারীই এ খাতে কাজ করেন। তারা আবার চিকিৎসক ও নার্সদের উপর পুরুষ ও নারীর সংখ্যার তুলনামূলক চিত্র প্রদান করেন।

 

মহামারির সময় যতটা কম সংখ্যক নার্স কাজে লাগানো যায়, ততকম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সে জন্য মহামারি বা সংকটকালীন সময় যেমন- ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, ভূমিধস, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা বা দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে পুরুষদের সংযুক্ত করতে পারলে তারা নারীদের চেয়ে বেশি ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে পারে।

মহামারিতে কর্মঘণ্টা দীর্ঘক্ষণ করলে জনবল বাঁচবে। অনেক সময় নারীরা সন্তান সম্ভবা, স্তন্যদানকারীসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকেন। ফলে আপদকালীন সময়ে পুরুষ নার্সদের বেশি বেশি সম্পৃক্ত করতে পারলে আমরা এতগুলো স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারতাম।

আরেকটি বিষয়, অনেক পুরুষ রোগীরা পুরুষ নার্স দিয়ে আর নারীরা নারী নার্স দিয়ে সেবা নিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এক্ষেত্রে রোগীর পছন্দের বিষয়টি বিবেচনায় পুরুষ নার্সদের এ পেশায় আগ্রহী করা দরকার। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে বিশ্বের সব দেশে নার্সিং পেশায় পুরুষদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশ এখনও ১০
শতাংশ কোটা রেখে দিয়েছে।

২০০৮ সালের ৩ জানুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নার্সিং ও পরিদর্শন শাখা থেকে সরকারি সেবা ইনস্টিটিউট ও কলেজের নার্সিংয়ে ভর্তি সংক্রান্ত একটি নীতিমালা জারি করে। সেখানে এই কোর্সে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি সংক্রান্ত শর্তাবলী অধ্যায়ের ৮ নম্বর কলামে বলা হয়, সেবা ইনস্টিটিউট বা কলেজের মোট আসনের সংখ্যার অনধিক ১০ শতাংশ আসন পুরুষ প্রার্থী কর্তৃক পূরণ করা হবে। বাকি ৯০ শতাংশ ভর্তি করা হয় নারী শিক্ষার্থীদের দ্বারা। ফলে অনেক পুরুষরা এ পেশায় আসার সুযোগ পাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, ভর্তি ক্ষেত্রে এই বিধানকে সংবিধানের ২৮ (৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ নিয়ে তৎকালীন সময়ে ভর্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। হাইকোর্ট কোটা স্থগিতের আদেশও দেন যা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়।

লেখক ছৈয়দ আহমদ তানশীর উদ্দীন

পুরুষদের এ পেশায় আগ্রহী করতে আমাদের একটি প্রস্তাবনা হল-
১. নার্সিং শিক্ষার্থী ভর্তি নারী-পুরুষ সমান সুযোগ রাখা।
২. আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতালে পুরুষদের নার্সিং কোর্স যেমন- অর্থোপেডিক, সার্জিকাল নার্সিং, ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিং, ইমারজেন্সি নার্সিং ও ডিজাস্টার নার্সিং ইত্যাদিতে সম্পৃক্ত করা।
৩. সংখ্যালঘু বিবেচনায় পুরুষদের আবাসন ও বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা।

আসুন লিঙ্গ বৈষম্য ভুলে নার্সিংয়ে নারী-পুরুষ সবার সমান সুযোগ রাখি। আমাদের স্বাস্থ্যসেবা সমুন্নত করি।

লেখক- নার্সিং কর্মকর্তা ও সাবেক শিক্ষক, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম। ইমেইল-syedahmedtanshiruddin@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.