মানুষের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠছে সেন্টমার্টিন দ্বীপের হাসপাতাল-দিন রাত সেবা দিচ্ছেন নার্স ও মিডওয়াইফরা

Spread the love
গত সোমবার সেন্টমার্টিন দ্বীপের একমাত্র সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফের মাধ্যমে দ্বিতীয় নবজাতকের জন্ম হয়েছে। এর আগে এখানেই গত ২ নভেম্বর প্রথম শিশুটির জন্ম হয়। দুইটি প্রসবেই সহায়তা করেছেন সেভ দ্য চিলড্রেন’এর মিডওয়াইফ।
সোমবার রাত প্রায় সাড়ে ১০টায় একজন গর্ভবতী নারী মদিনা (২০) প্রসববেদনা নিয়ে হাসপাতালটিতে আসেন। অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তৎক্ষণাৎ প্রসবের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করা হয় এবং রাত প্রায় সাড়ে এগারটায় সুস্থ নবজাতক ছেলে শিশুটি জন্মগ্রহণ করে।
মিডওয়াইফ রবিনা বলেন, “প্রসবের পর সারা রাত আমরা সজাগ ছিলাম এবং মা এবং নবজাতকের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছি। সম্পূর্ণ সুস্থ থাকার কারনে সকালেই তারা বাড়ি চলে যেতে পেরেছে।” অপর মিডওয়াইফ সোমা বলেন, “বাড়ি ফেরার আগে মায়ের যে হাসিমুখটি দেখেছি, তা আমাদের বিশ্বাস আর অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। প্রতিদিন আমরা গড়ে ১০ জন গর্ভবতীকে প্রসবপূর্ব সেবা দিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা এই দ্বীপের মানুষের জন্য আমাদের এই কাজ চালিয়ে যাব।”
দশ শয্যার হাসপাতালটি এই দ্বীপের স্বাস্থ্য পরিষেবার একমাত্র জায়গা। এখানে মাত্র দু’জন- একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার এবং সাপোর্ট স্টাফ কর্মরত ছিলেন। কিন্তু বিদ্যুৎ এবং নিরাপদ পানির অভাবে হাসপাতালটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে ছিলো। অথচ সমুদ্রপথে নৌযানে করে টেকনাফে চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। যার কারনে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য ও নিরাপদ প্রসব এর মতো বিষয়ে দ্বীপটিতে কোন আশার আলো ছিলোনা।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এবং গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা (জিএসি) এর সহায়তায় সেভ দ্য চিলড্রেন এসআরএইচআর প্রকল্পের মাধ্যমে স¤প্রতি এই হাসপাতালে দু’জন প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ নিয়োগ করে। এর কিছু দিন আগে, ইউএসএআইডির অর্থায়নে মামনি-এমএনসিএসপি প্রকল্প থেকে এই হাসপাতালে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ ও স্থানীয় সরকার অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করেছে।
কাজে যোগদানের প্রথম দিন থেকেই সেভ দ্য চিলড্রেন এর এই মিডওয়াইফরা প্রসবপূর্ব যত্ন ও সেবা দেয়া শুরু করেন। এবং গত ২ নভেম্বর সফলভাবে প্রথম প্রসবটিতে সহায়তা করেন। এই হাসপাতালে দক্ষ মিডওয়াইফের সহায়তায় জন্ম নেয়া প্রথম শিশুর মা নুর কায়দা ১ নভেম্বর হাসপাতালে আসেন এবং পরের দিন সকালে, সেভ দ্য চিলড্রেন’এর মিডওয়াইফ রবিনা এবং সোমা, সফলভাবে প্রসব সম্পন্ন করান। এটি ২০০৮ সালের পরে অর্থাৎ এই হাসপাতাল তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফের মাধ্যমে করা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রথম স্বাভাবিক প্রসব যা দ্বীপবাসীর কাছে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
“সন্তান প্রসবের জন্য সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমি মূল ভূখণ্ডে, টেকনাফে যেতে চাইনি। আমার মত একজন গর্ভবতীর জন্য খরচ, সময় এবং ঝুঁকির দিক থেকে এটা অনেক কঠিন”, বলেন নুর কায়দা (২০)।
তিনি আরো বলেন, “আগে এই জনপদে প্রসবের জন্য প্রশিক্ষিত কেউ ছিল না। কিছুদিন আগে আসা এই দুইজন মিডওয়াইফ আশার আলো হিসেবে এখানে আসেন। তারা (মিডওয়াইফরা) আমার অবস্থা পরীক্ষা করেছিলেন, পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকতে সহায়তা করেছিলেন। তাদের সহায়তায় আমি সুস্থ একটি মেয়ের জন্ম দিতে পেরেছি।”
প্রায় ৯ হাজার অধিবাসীর এই সেন্ট মার্টিনস দ্বীপের বেশিরভাগই দরিদ্র জেলে। নিরাপদে শিশুর জন্মের খবরটি দ্বীপের প্রতিটি কোণে তাই খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এবং দ্বীপের সবাই মিডওয়াইফদের সেবায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। রাতারাতি রবিনা এবং সোমা এই দ্বীপের মানুষের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.