মৃত্যুঝুকি উপেক্ষা করে করোনা রুগীর সেবায় নার্সরা,অনেক সময় পালিয়েছেন স্বজনরা

Spread the love

ডেস্ক রিপোর্ট : গত বছরের মার্চে দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর নড়ে চড়ে বসে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসটিতে প্রাণ হারানোর আতঙ্কে আক্রান্তদের পাশে যাওয়ার কথা ভাবতেই ভয়ে কাঁপতে থাকে মানুষ। এমন সময় অসুস্থ সন্তানের কাছে পিতা এবং পিতার কাছে যেতে সন্তানও হয়ে উঠে নির্মম হিসেবি।

এ রকম ভয়াল এক পরিস্থিতিতে সবাই যখন সামাজিক দূরত্ব আর নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে চিন্তিত। তখন জীবনবাজি রেখে রোগীদের সেবায় নিজেদের সর্বস্ব নিয়োগ করেছেন নার্সরা।

করোনা রোগীদের সেবায় জড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনএ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল শাখার সভাপতি কামাল হোসেন পাটওয়ারী মেডিভয়েসকে বলেন, করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সবাই ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। এর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আমরা আক্রান্তদের সেবায় নিয়োজিত হই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে যখন প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীকে স্বাস্থ্য সেবা দিতে গিয়ে ভয় পেয়েছিলেন। তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিটে একজন রোগী ভর্তি হয়, তখন চিকিৎসক ও নার্সরা মনোবল ধরে রেখে তার সেবা করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, করোনার শুরুতে এমনও দিন ছিল ঢাকা মেডিকেলে হাজার হাজার রোগী ভর্তি হয়েছে। তখন চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রোগীর সেবা করেছেন। কোনো রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হয়নি। কোনো কোনো রোগীকে হাসপাতালের বাড়ান্দায় রেখেও সেবা দেওয়া হয়েছে।

কেউ না থাকলে রোগীর পাশে নার্স

কামাল পাটওয়ারী বলেন, করোনা শুরু হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে একজন করোনার রোগী মারা যান। ওই ব্যক্তির লাশ নেওয়ার জন্য তাঁর স্ত্রী ছেলে-মেয়ে, পরিবার-পরিজনের কেউ আসেনি। কিন্তু তাকে নার্সরা যত্ন সহকারে সেবা দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি সবচেয়ে গর্ব বোধ করি, যখন করোনা চক্রের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জেলাভিত্তিক প্রেস কনফারেন্স করেছেন। সব কনফারেন্সেই প্রধানমন্ত্রী কোনো না কোনো নার্সের সাথে কথা বলেছেন এবং করোনা রোগীদের কি অবস্থা তা জেনেছেন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এতে নার্সরা গর্ববোধ করেছেন। আর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নার্সরা যেসব সেবা দিয়েছেন তা ভোলার মতো নয়। নার্সরা এতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রোগীর সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন।’

প্রণোদনায় খুশি নার্সরা

করোনাভাইরাস শুরু হওয়ার পর রোগীদের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে ঘোষিত প্রণোদনার টাকা হাতে পেয়েছেন নার্সরা। বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘করোনা রোগীর সেবায় নিয়োজিত সকল নার্স প্রণোদনার টাকা পেয়েছেন।’

কামাল হোসেন পাটওয়ারী বলেন, ‘ঢামেক হাসপাতালের দুটি করোনা ইউনিট রয়েছে। এ ইউনিটগুলোতে করোনার শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ১৬২ জন কাজ করেছেন। এদের সবাই প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রণোদনা পেয়েছেন। এসব নার্সদের হাতে প্রণোদনার টাকা তুলে দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক। পরবর্তীতে যারা কাজ করবেন তারাও প্রণোদনার আওতায় আসবেন।

এ প্রসঙ্গে ঢামেক হাসপাতালের নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক শিখা বিশ্বাস মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যেসব নার্স করোনায় আক্রান্ত হবেন, তারা পাবেন দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ প্রণোদনা। ইতিমধ্যে সেই প্রণোদনার টাকা আমরা হাতে পেয়েছি।’

 

বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৩ হাজার ৪৩১ জন করোনায় আক্রান্ত হন। আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৩৬ জন নার্স।

সেবা দিতে গিয়ে নার্সিং সুপারভাইজারের মৃত্যু

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মোট পাঁচজন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে প্রথম মৃত্যুবরণ করেছেন ঢামেক হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার সাহিদা আক্তার। তিনি করোনা ইউনিটি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় করোনায় আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে কোভিড আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর না ফেরার দেশে চলে যান তিনি।

ওই নার্সি কর্মকর্তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কামাল হোসেন বলেন, ‘রোগীর সেবায় সবসময় অম্লান ছিলেন সাহিদা আক্তার। তিনি রোগীর সাথে মিশে যেতে পারতেন। দায়িত্বের প্রতি আমানতদার ছিলেন সাহিদা আক্তার।’

রোগীর সুস্থতায় নার্সদের সন্তুষ্টি

একজন রোগী সুস্থ হলে খুবই আনন্দবোধ করেন নার্সরা। রোগীকে সুস্থ করে তোলার জন্য দিন-রাত আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান তারা। অনেক সময় নার্স ছাড়া রোগীর সেবা কল্পনাই করা যায় না হাসপাতালে। রোগীর খাবার-শয্যা প্রস্তুতসহ সবকিছুই করতে হয় হাসপাতালে থাকা নার্সদের।

এ প্রসঙ্গে শিখা বিশ্বাস বলেন, ‘রোগীর ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন চিকিৎসক। কিন্তু সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াসহ রোগীর কাছ পর্যন্ত পৌছে দেওয়ার সব দায়িত্ব থাকে নার্সদের উপর। একজন রোগীকে সুস্থ করে তোলার ক্ষেত্রে সিংহভাগ দায়িত্ব পালন করে থাকেন নার্সরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘কাজ করতে অনেক সময় নার্সরা সমস্যার সম্মুখীন হন। সে বিষয়ে আমরা যখন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে যাই। তখন তা যেন গুরুত্ব সহকারে দেখা হয় এবং আমাদের দিকে সুনজর দেওয়া হয়।’

নার্সদের প্রসংশায় পঞ্চমুখ ঢামেকহা পরিচালক

করোনাভাইরাসের আক্রান্ত রোগীদের সেবায় নার্সদের প্রসংশা করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক। রোগীদের স্বাস্থ্য সেবায় তাদের নিষ্ঠার কথা তুলে ধরে মেডিভয়েসকে তিনি বলেন, ‘করোনাকালে রোগীর সেবায় নার্সরা নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সেবা করেছেন। নার্সদেরকে যেসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা তারা আন্তরিকতার সাথে পালন করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘নার্সরা রোগীদের খুবই কাছে থাকেন। রোগীর সমস্যা-অসুবিধাগুলো প্রথম নার্সরাই দেখেন। শুধু তাই নয়, ওয়ার্ড বয়-স্বাস্থ্যসেবা কর্মী যারা রয়েছেন, তাদের কাছেও রোগী এবং রোগীর স্বজনরা যান। একজন রোগীর সুস্থ হওয়ার পেছনে নার্সদের অবদান ব্যাপক। চিকিৎসকরা রোগীকে দেখেন এবং বিভিন্ন পরামর্শ দেন। এখানে চিকিৎসকের কাজ শেষ হয়ে যায়। এছাড়া কোনো মারাত্মক রোগী হলে চিকিৎসককে আবার আসতে হয়। আর রোগীর পাশে সারাক্ষণ থাকেন নার্স।’

তিনি আরও বলেন, ‘নার্স এবং সেবাকর্মীরা যদি আন্তরিক থাকেন তাহলে রোগীরা সঠিক সেবা পাবেন। এতে সেবার মান দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া কীভাবে পরিবেশটাকে নার্সদের কাজ করার উপযোগী হয় সেজন্য আমরা চেষ্টা করছি। নার্সদেরকে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছি।’

নার্সদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা

তিনি আরও বলেন, ‘নার্সদেরকে আমরা কোভিড প্রণোদনা দিয়েছি। আগামী দিনে নার্সদের অবদানের জন্য তাদের পুরস্কৃত করবো। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যে নার্সদেরকে পুরস্কৃত করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কিছুদিন আগে নার্সদেরকে নিয়ে এক জায়গা থেকে আমরা পুরস্কার নিয়ে এসেছি। এছাড়াও তাদের কর্মদক্ষতা বাড়ানো এবং উৎসাহ দেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

©Medivoicebd.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.